মুহাম্মদ ইউনুস:
আগামীকাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন একটি সময়ে আমাদের সবারই বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বরং বাস্তবতা, তথ্য ও যুক্তির আলোকে দেখা প্রয়োজন।
ভারুয়াখালীকে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পেছনে কয়েকটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি-
১. একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন কেন নয়?
প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের সীমানায় কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পিএমখালী ও ঝিলংজার অংশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমরা অন্য কোনো এলাকার অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করছি না। বরং আমাদের প্রশ্নটা খুব সহজ—
যদি প্রস্তাবিত নগর সীমানা সদর উপজেলার বাইরে গিয়ে রামু উপজেলার এলাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, তাহলে সদর উপজেলারই একটি ইউনিয়ন ভারুয়াখালীকে বাইরে রাখার সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ কী?
কোন্ ভৌগোলিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক বা নগর-পরিকল্পনাগত মানদণ্ডে ভারুয়াখালীকে বাদ রাখা হয়েছে? —এই প্রশ্নটির একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
২. মানচিত্র ও ভৌগোলিক বাস্তবতা:
নিচে আপলোডকৃত কক্সবাজার সদর উপজেলার মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারুয়াখালী প্রস্তাবিত নগর এলাকার পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর সঙ্গে সরাসরি ভৌগোলিকভাবে যুক্ত। একদিকে খুরুশকুল, অন্যদিকে পিএমখালী ও ঝিলংজা, আর উত্তরে চৌফলদণ্ডী—সব মিলিয়ে বৃহত্তর এই এলাকার সঙ্গে ভারুয়াখালীর যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে।
সিটি কর্পোরেশন তো শুধু আজকের জন্য নয়। আগামী ৩০–৩৫ বছরে কক্সবাজার শহর কোন দিকে সম্প্রসারিত হবে, কোথায় নতুন বসতি গড়ে উঠবে, কোথায় শিল্প-বাণিজ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হবে—এসব বিষয়ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার অংশ।
তাই বর্তমান সীমানা নির্ধারণের সময় ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন নয় কি?
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন:
ভারুয়াখালী আর আগের মতো যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকা নয়। দুইপাশের দুইটি সংযোগ সেতু এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে কক্সবাজার শহরের সঙ্গে এ এলাকার যোগাযোগ ক্রমেই সহজ হচ্ছে।
কক্সবাজার পৌরসভা থেকে ভারুয়াখালীর দূরত্ব মাত্র ৮.৫ কিলোমিটার। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শহর ও ভারুয়াখালীর মধ্যে যোগাযোগের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব, নগর সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় এই বাস্তবতাটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন নয় কি?
৪. ভারুয়াখালীর অর্থনৈতিক ও উৎপাদনমূলক গুরুত্ব:
সিটি কর্পোরেশন মানেই শুধু দালান-কোঠা, মার্কেট ও পাকা রাস্তা নয়। একটি শহরের অর্থনৈতিক জীবনকে সচল রাখতে তার আশপাশের উৎপাদনশীল এলাকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
ভারুয়াখালীর কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড বৃহত্তর কক্সবাজারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তাই ভারুয়াখালীকে শুধু একটি গ্রামীণ প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে না দেখে, ভবিষ্যৎ নগর অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্ভাব্য সংযোগও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৫. নদী, খাল, কৃষিজমি ও পরিকল্পিত নগরায়ণ:
আমাদের নদী আছে, খাল আছে, কৃষিজমি আছে। কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারেন—এগুলো গ্রামীণ এলাকার বৈশিষ্ট্য, সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্তি মানেই যে সব কৃষিজমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা থাকলে কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় কৃষিজমি সংরক্ষিত থাকবে, কোথায় জলাধার ও খাল রক্ষা করা হবে—এসব বিষয় পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোই ভবিষ্যৎ নগরায়ণের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলোও পরিকল্পিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
৬. সিটি কর্পোরেশন আইন, ২০০৯-এর আলোকে বিষয়টি দেখা দরকার:
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৩-এ সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, জনঘনত্ব, স্থানীয় আয়ের উৎস, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। একই আইনের ধারা ৪-এ সিটি কর্পোরেশনের সংলগ্ন এলাকা সীমানার অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে। তাই ভারুয়াখালীর ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, অবকাঠামো, ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এবং স্থানীয় মানুষের মতামত —সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ইউনিয়নবাসীর মতামতের কথ যদি বলি- ভারুয়াখালীর ৯৯% মানুষ অন্তর্ভুক্তির পক্ষে। যথাক্রমে ১৯ ও ২১ সেপ্টেম্বর ভারুয়াখালী বাজারে ও ডিসি অফিসের সামনের মানববন্ধন-ই তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ঠ। প্রয়োজন হলে ভারুয়াখালীর মানুষ আরো কঠিন আন্দোলন গড়ে তুলতেও প্রস্তুত রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—ভারুয়াখালীকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী?
আমরা অন্য কোনো এলাকার অধিকার বা স্বার্থের বিরুদ্ধে নই। প্রশ্নটা শুধু ভারুয়াখালীকে নিয়ে।
একই প্রস্তাবিত নগর এলাকার ক্ষেত্রে যদি ভৌগোলিক সংযোগ, যোগাযোগ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচ্য হয়, তাহলে ভারুয়াখালীর ক্ষেত্রেও কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করে মূল্যায়ন করা হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেই মূল্যায়নের ভিত্তি কী—এটি জানা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অধিকার।
শেষ কথা
আজ যে সীমানা নির্ধারণ করা হবে, তার প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মের ওপর নয়; এর সঙ্গে আগামী দিনের কক্সবাজারের নগর কাঠামো ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎও জড়িত।
আমাদের প্রত্যাশা—সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি যেন কোনো আবেগ, চাপ বা কোনো এলাকার প্রতি পক্ষপাতের ভিত্তিতে না হয়; বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য, একই মানদণ্ড, ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মানুষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণ করা হয়।
সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের।
আমাদের দায়িত্ব হলো যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতার আলোকে আমাদের কথাগুলো তুলে ধরা।
ভারুয়াখালীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হোক আবেগে বা একক স্বার্থে নয়; সকলের স্বার্থে, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে।
আগামীকাল আমাদের স্লোগান হোক- “রামু যখন সিটিতে, সদর কেন বাইরে?”
কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা: ভারুয়াখালীকে ঘিরে কিছু বাস্তব প্রশ্ন
পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে
